Log in
English

আত্মা ও পরমাত্মার সম্পর্ক, অভিধেয় ও প্রয়োজন কী?

Mar 11th, 2025 | 6 Min Read
Blog Thumnail

Category: Spirituality

|

Language: Bangla

অজ্ঞানমেবাস্য হি মূলকারণ্যং তদ্ধানমেবাত্র বিধৌ বিধীয়তে। 
বিদ্ধেইব তান্নাসবিধৌ পটীয়সী ন কর্ম তহ্যাঙ সবিরোধমীরিতং।।
(অধ্যাত্ম রামায়ণ, উত্তরকাণ্ড)

দুঃখের মূল কারণ হল সঠিক জ্ঞানের অভাব এবং আমাদের শাস্ত্রে সেই জ্ঞানের অভাব দূর করার উপায় আছে। একমাত্র সঠিক জ্ঞানের দ্বারাই অজ্ঞানতা নাশ করা সম্ভব। সকাম কর্ম (কোন মনস্কামনা পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে কৃত কর্ম)-এর দ্বারা কিন্তু অজ্ঞানতা নাশ করা সম্ভব নয়। কারণ অজ্ঞানী মনের সৃষ্ট কর্ম নিজের উৎসের (অর্থাৎ মনের অজ্ঞানতার) বিরোধিতা করতে পারে না। কাজেই, ন্যায়সূত্র অনুযায়ী, অজ্ঞানতার থেকে উৎপন্ন কর্ম অজ্ঞানতা নষ্ট করতে পারে না।

গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এই সংসারকে “দুঃখালয়ম অশাশ্বতম্” বলেছেন।  অর্থাৎ, এই সংসার দুঃখ-পূর্ণ ও অস্থায়ী। দুঃখে ভরা এই সংসারের প্রত্যেক মানুষ সুখের আশা করে এবং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত শুধু সুখ লাভ করারই চেষ্টা করে যায় – তা সত্ত্বেও ছিটেফোঁটা সুখ জোটে না তাদের। এরকম কেন? আমাদের কি চেষ্টায় কোন খামতি থেকে যায়? নাকি ভাগ্যেই সুখ নেই? যদি শুধু আমি অসুখী হতাম; আর আমার চারপাশের সবাইকে খুব সুখী দেখতাম – তাহলে নাহয় বলা যেত যে আমার চেষ্টায় ত্রুটি থেকে গিয়েছে অথবা আমার ভাগ্যটাই খারাপ। প্রকৃতপক্ষে এই সংসারে কেউই সুখে নেই – তা সে যতই ধনবান বা ক্ষমতাশালীই হোক না কেন।

বেদব্যাস বলেছেন –
যৎপৃথিব্যাম বৃহি য়বম হিরণ্যম পশবস্ত্রিয়হ। নালমেকস্য পর্যাপ্তম তস্মাদতৃষ্ণাম পরিত্যাজেৎ।।   
"যদি কেউ বিশ্বের সমস্ত সুখও লাভ করে, তাও তার ইচ্ছার সমাপ্তি ঘটবে না"
শাস্ত্রানুসারে বাস্তবিক আনন্দের মধ্যে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ লক্ষ্য করা যা:
১। অনন্ত মাত্রা
২। অনন্ত কাল স্থায়িত্ব
৩। নিত্যনতুন
৪। উত্তরোত্তর বর্ধিষ্ণু
৫। জড় তো নয়ই; বরং চেতন
৬। সর্বজ্ঞ

অথচ, সংসারে লাভ করা সুখের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যা:
১। সীমিত পরিমাণ; কখনও আমরা দুঃখ তুলনামূলকভাবে কম পেলে সেটাকেই সুখ বলে অনুভব করি
২। ক্ষণস্থায়ী; দুঃখ আবার প্রবল হয়ে সুখের অনুভূতিকে সরিয়ে দেয়
৩। প্রতিমুহূর্তে ক্ষয়শীল; কোন বস্তুকে যত বেশী উপভোগ করা যায়, ততই ওই বস্তু থেকে প্রাপ্ত সুখের অনুভব কমতে থাকে

আমাদের পূর্বপুরুষ, আমাদের  বাবা-মা - তথা সমস্ত মানুষ চিরকাল ধরে শুধু আনন্দেরই সন্ধান করে চলেছে। কিন্তু সঠিক জ্ঞানের অভাবে সবাই সংসারেই সুখ খুঁজছে – এটাই বিড়ম্বনা। আমরা সবাই মায়াশক্তির বশীভূত; তাই আমাদের মন ও বুদ্ধি মায়িক (জাগতিক)।

যেমন, সন্ত তুলসীদাস বলেন –
গো গোচর জহ লগি মন জাই। সো সব মায়া জানেহু ভাই।।
"
আমাদের ইন্দ্রিয়, মন, বুদ্ধির যতখানি সীমানা, সবটাই মায়ার অধিকৃত ক্ষেত্র।"
আমাদের মন মায়িক (মায়া দ্বারা নির্মিত); স্বভাবতই আমরা মায়িক মানুষ এবং সহজেই মায়িক বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ি। মায়ার অধীন বলেই আমরা এই অস্থায়ী তথা দুঃখপূর্ণ সংসারেই সুখের অন্বেষণ করে বেড়াই। এই অজ্ঞানতার কারণেই অনন্ত জন্ম পার করেও আমরা সুখ লাভ থেকে বঞ্চিত। মায়ার বশে থাকে বলে মানুষ অবিদ্যায় গ্রস্ত হয়, আর সেখান থেকেই আসে অজ্ঞানতা। অজ্ঞানতাবশত মানুষ ৪টি ভ্রান্তির শিকার হয় – 

১। অনিত্যকে নিত্য বোধ করা

এই সংসার একদিন সৃষ্টি হয়েছে; একদিন ধ্বংসও হয়ে যাবে। এভাবেই এই সংসারের সমস্ত বস্তু ক্ষণভঙ্গুর। একজন ব্যক্তি অথবা একটি বস্তুর অস্তিত্ব কতদিন – তা কেউ জানে না। তাও আমরা জাগতিক সামগ্রী সংগ্রহ করতে ব্যস্ত থাকি; আর যেদিন সেই বস্তুর অস্তিত্ব শেষ হয়, সেদিন দুঃখ করি। এই দুঃখের তো একটাই মাত্র কারণ - আমাদের ভ্রান্তি যে অস্থায়ী সাংসারিক বস্তু জোগাড় করে সুখ লাভ হবে। 

২। অসত্যকে সত্য বোধ করা

সমস্ত মানুষ নিজের মা, বাবা, ভাই, বোন, ছেলে, মেয়ে প্রভৃতির সাথে অভিন্ন সম্বন্ধ স্থাপন করে। এই শারীরিক সম্পর্কগুলিকে আমরা চিরকালীন মনে করি এবং সেই মানুষগুলি যখন দেহত্যাগ করেন – তখন আমরা ঘোরতর দুঃখ অনুভব করি।

৩। অনাত্মকে আত্ম বোধ করা

এই ভ্রান্তির মূল কারণ হল - আমরা ‘আমি’ বলতে আমার শরীরকেই বুঝি। এই শরীর পঞ্চভূত দ্বারা নির্মিত। প্রকৃতপক্ষে, ‘আমি’ হল আত্মার সম্বোধন; আর শরীর ‘আমার’ – অর্থাৎ আত্মার বহিরাবরণ। শরীর-সম্পর্কিত ব্যক্তিদের ‘আমার’ সম্বন্ধী মনে করা, ইন্দ্রিয়সুখপ্রদানকারী বস্তুকে ‘আমার’ সুখের কারণ মনে করা এবং প্রকৃত দিব্যানন্দের বিষয়ে অনভিজ্ঞতাই এক ভ্রম – যা দুঃখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 ৪। দুঃখকে সুখ অনুভব করা

 সংসারে আনন্দ আছে – আমাদের বুদ্ধি এই ভ্রমে এতখানি আচ্ছন্ন যে, সংসারের বস্তু লাভ করলেই আনন্দ লাভ হবে – এই দৃঢ় বিশ্বাস বুদ্ধিতে গেঁথে আছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য এই যে – সংসার ও সাংসারিক বস্তুর কামনাই সমস্ত দুঃখ-কষ্টের কারণ। সাংসারিক বস্তুর কামনা পূর্তিতে লোভ জেগে ওঠে ও কামনা অপূর্ণ থাকলে ক্রোধের সৃষ্টি হয়। এর থেকেই পরবর্তীকালে আরও অনেক মানসিক বিকার – ঈর্ষা, কোপ, অহঙ্কার, মদ, মাৎসর্য প্রভৃতির সৃষ্টি হয়।

প্রথমত, আমরা নিজেরাই নিজেদের ঠিকভাবে জানি না – আমি কে, এবং আমার কে – এই প্রশ্নের যথার্থ উত্তর নেই আমাদের কাছে। আমরা নিজেদের শরীর বলেই মনে করি ও শরীর-সম্পর্কিত ব্যক্তিদের আপনজন বলে মনে করি। শরীরকে সুখ দেওয়ার জন্য অনেকরকম কাজ করি। আর সেই কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েই আমাদের বিভিন্ন শরীর ধারণ করে সংসারে প্রত্যাগমন করতে হয়; নিজেদের কর্ম অনুযায়ী সুখদুঃখ ভোগ করতে হয় ও মৃত্যুবরণ করতে হয়। এই জন্মমৃত্যুর চক্রেই আমরা অনাদিকাল থেকে আবদ্ধ আছি।

শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ গ্রন্থে গোকর্ণ তাঁর পিতাকে বলেন -
অসারঃ খলু সংসারো দুঃখরূপী বিমোহকঃ । সুতঃ কস্য ধনং কস্য স্নেহবান্-জ্বলতে-নিশম্।।
“পিতা! এই সংসার অসার। এই সংসার অত্যন্ত দুঃখজনক এবং মোহের অন্ধকারে ডুবিয়ে দেয়। পুত্র কার? ধন কার? স্নেহবান পুরুষ রাত-দিন দীপকের ন্যায় জ্বলতে থাকেন। ইন্দ্রই হোক বা চক্রবর্তী রাজা – সুখ কেউই লাভ করেন না। ‘এ আমার পুত্র’ – এই অজ্ঞানতা ত্যাগ করুন। মোহের কারণে নরক প্রাপ্তি হয়।“   
নিজেকে শরীর ভাবা ও সংসারে সুখের কামনা করা যদি অজ্ঞানতা হয় তবে বাস্তবিক জ্ঞান কী? এমন বহু প্রশ্ন জেগে ওঠে আমাদের মনে যেগুলির উত্তর খুঁজে পাওয়া অপরিহার্য হয়ে ওঠে – কারণ এই প্রশ্নগুলি অমীমাংসিত থেকে গেলে না আমরা এই দুঃখালয় থেকে মুক্তি পাব; না সুখ পাব।  সেই প্রশ্নগুলি হল –

১। আমি যদি শরীর না হই, তবে আমি কে?

২। সংসারে যদি সুখ না থাকে, তবে সুখ আছে কোথায়?

৩। সেই সুখ প্রাপ্তি কী করে ঘটবে আমার?

এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর বেদ-শাস্ত্র থেকে পাওয়া যায়। 
ঈশ্বর অংশ জীব অবিনাশী, চেতন অমল সহজ সুখ রাশি (রামায়ণ)

মমৈবাংশো জীব লোকে জীব ভুতঃ সনাতনঃ (গীতা)
এই সব গ্রন্থ বলছে যে – আমরা ভগবানের অংশ, আমরা আত্মা এবং ঈশ্বরের অংশ বলেই আমরাও তাঁর মতই সনাতন। 

দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর – বাস্তবিক সুখ সংসার(মায়া দ্বারা নির্মিত)-এ নেই, সুখ একমাত্র ভগবান (দিব্য ব্যক্তিত্ব)-এর কাছেই লাভ করা যায়। ভগবানের অপর নামই আনন্দ। বেদ-শাস্ত্র বারবার বলছে –
আনন্দো ব্রহ্মেতি ব্যজানাৎ। ( তৈত্তিরীয়োপনিষদ্ - ৩.৬) 
“ভগবানকে আনন্দ মানো।“

কেবলানুভবানন্দস্বরূপঃ পরমেশ্বরঃ। (শ্রীমদ্ভাগবতম্ – ৭.৬.২৩)
“ভগবানের স্বরূপ বাস্তবিক আনন্দের দ্বারা নির্মিত।“

আনন্দ মাত্র কর পাদ মুখোদরাদি। (পদ্ম পুরাণ)
“ভগবানের হাত, পা, মুখ ও উদরাদি আনন্দ দ্বারা নির্মিত।“

জো আনন্দ সিন্ধু সুখরাসী। সীকর তেঁ ত্রৈলোক সুপাসী।।
সো সুখধাম রাম অস নামা। অখিল লোক দায়ক বিশ্রামা।। (রামচরিতমানস)
“এই যে আনন্দসমুদ্র ও সুখের রাশি – যাঁর (আনন্দসিন্ধুর) এক কণায় তিন লোক সুখী হয়, তাঁর নাম রাম, যিনি সুখের ভবন ও সম্পূর্ণ ত্রিলোককে শান্তি দিতে পারেন।“
এই সমস্ত শাস্ত্রবাক্য প্রমাণ করে যে আমরা জীবাত্মা, আমরা ভগবানের অংশ এবং ভগবান সুখসিন্ধু। এবার তৃতীয় প্রশ্নটা দেখা যাক – আমরা কী করে সুখ লাভ করব?

 এর উত্তর খুবই সরল। যেহেতু ভগবান আনন্দস্বরূপ, সুতরাং যে মুহূর্তে আমরা ভগবানকে খুঁজে পাব, সেই মুহূর্তেই আমরা আনন্দময় হব ও আমাদের দুঃখ চিরতরে বিদায় নেবে। শাস্ত্র বলে –
রসো বৈ সঃ। রসংহ্যেবায়ম লব্ধ্বা আনন্দী ভবতি।  
তিনিই রস। তাঁকে লাভ করেই জীব আনন্দময় হবে – অর্থাৎ ভগবান শ্রীকৃষ্ণই আনন্দ; তাঁকে লাভ করেই জীব আনন্দ লাভ করবে।

এখন প্রশ্ন হল, আমরা ভগবানকে কবে ও কিভাবে প্রাপ্ত করব? এর জন্য সম্বন্ধ (সম্পর্ক), অভিধেয় (পথ) এবং প্রয়োজন (লক্ষ্য) – এই তিন তত্ত্বের পূর্ণ জ্ঞান অত্যাবশ্যক। এই তিনটি তত্ত্ব ভালভাবে জানার পরেই আমাদের ঈশ্বর প্রাপ্তি তথা অনন্তকালের জন্য আনন্দ লাভ করা সম্ভব।
বেদ শাস্ত্র কহে সম্বন্ধ অভিধেয় প্রয়োজন।
কৃষ্ণ, কৃষ্ণ ভক্তি, প্রেম, তিন মহাধন।।

সম্বন্ধ

সর্বপ্রথম তো জানতে হবে যে ভগবানের সাথে আমাদের বাস্তবিক সম্পর্কটা কী? আমরা ভগবানের অংশ, তিনিই আমাদের মাতা, পিতা, সখা, স্বামী। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন –
জীবের স্বরূপ হয় কৃষ্ণের নিত্য দাস। (চৈতন্য চরিতামৃত মধ্যলীলা ২০.১০৮)
জীব, অর্থাৎ আমাদের বাস্তবিক স্বরূপ বা সম্বন্ধ হল আমরা শ্রীকৃষ্ণের নিত্য দাস এবং তিনি আমাদের প্রভু।

অভিধেয়

ভগবানের কাছে পৌঁছাতে হলে কোন মার্গ অবলম্বন করা উচিত – এটাই অভিধেয়। শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভুর বক্তব্য অনুসারে আমাদের অভিধেয় হল কৃষ্ণ ভক্তি – অর্থাৎ ভক্তিমার্গ অবলম্বন করে আমরা শ্রীকৃষ্ণকে প্রাপ্ত করতে পারি।

প্রয়োজন

আমাদের লক্ষ্য কী – এটাই প্রয়োজন।  সংসারে যেমন মানুষ একটা লক্ষ্য বা প্রয়োজন নিয়ে কাজ করে, সেরকমই আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেও সাধক একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে সাধনা করে। আমাদের সাথে শ্রীকৃষ্ণের বাস্তবিক সম্বন্ধ হল দাসত্বের – কাজেই আমাদের প্রয়োজন অথবা লক্ষ্য হল শ্রীকৃষ্ণের দিব্য সেবা লাভ করা।

এই সম্পূর্ণ প্রবন্ধের সারাংশ হিসাবে বলা যায় –  শ্রীকৃষ্ণের দিব্য সেবাই আমাদের প্রয়োজন। শ্রীকৃষ্ণের ভক্তি আমাদের অভিধেয়; শ্রীকৃষ্ণ আমাদের প্রভু ও আমরা তাঁর দাস – এটাই আমাদের প্রকৃত ও একমাত্র সম্বন্ধ।