Log in
English

আমাদের প্রেরণার দুই চালিকাশক্তি: অভ্যন্তরীণ বনাম বাহ্যিক

Mar 9th, 2025 | 6 Min Read
Blog Thumnail

Category: Mind Management

|

Language: Bangla

কী এমন শক্তি আছে, যা মানুষকে অসম্ভবকেও সম্ভব করতে উদ্বুদ্ধ করে? এমন কী রহস্য, যা আমাদের ক্লান্তি আর বাধার পাহাড় ডিঙিয়ে লক্ষ্য অর্জনের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়? প্রেরণা—এক শক্তিশালী এবং জটিল বিষয়, যা আমাদের মন ও মস্তিষ্ককে চালিত করে।

এই প্রবন্ধে আমরা প্রেরণার সেই গোপন সূত্র উন্মোচন করব এবং বিশ্লেষণ করব দুটি প্রধান শক্তি—বাহ্যিক প্রেরণা, যা পুরস্কার বা স্বীকৃতির মতো বাহ্যিক উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়, এবং অভ্যন্তরীণ প্রেরণা, যা আমাদের মনের গভীরতম ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত। এই শক্তিগুলি কেবল আমাদের কর্মক্ষমতা নয়, আমাদের জীবনের দিকনির্দেশক হিসেবেও কাজ করে।

তাহলে চলুন, প্রেরণার এই রহস্যময় জগতে প্রবেশ করি এবং খুঁজে বের করি, কীভাবে এই শক্তি আমাদের জীবনের প্রতিটি চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে সাহায্য করতে পারে।

বাহ্যিক প্রেরণা: একটি দ্বিমুখী তলোয়ার

বাহ্যিক প্রেরণা মূলত পুরস্কার, স্বীকৃতি বা চাপের মতো বাইরের উপাদান থেকে উৎপন্ন হয়। এটি অল্প সময়ের জন্য কাজকে ত্বরান্বিত করতে পারে, যেমন বসের প্রশংসা, প্রতিশ্রুতি বা পুরস্কার। তবে, এই প্রেরণার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর অস্থায়ী প্রকৃতি। যখন বাহ্যিক উৎস বন্ধ হয়ে যায় বা প্রত্যাশিত ফল মেলে না, তখন প্রেরণার শক্তি হ্রাস পায়।

এজন্য প্রকৃত এবং দীর্ঘস্থায়ী অনুপ্রেরণা, অভ্যন্তরীণ লক্ষ্য ও মূল্যবোধ থেকে আসে। এটি আমাদের গভীর মনোযোগ ও একাগ্রতা তৈরি করতে সহায়তা করে, যা আমাদের বিভ্রান্তি অতিক্রম করে সফল হতে সাহায্য করে।

রাজা জনকের গল্প: অভ্যন্তরীণ প্রেরণার শক্তি

রাজা জনকের গল্প অভ্যন্তরীণ প্রেরণার শক্তিকে উদাহরণস্বরূপ তুলে ধরে, যার থেকে মনোযোগ ও বৈরাগ্য গড়ে ওঠে। অগাধ সম্পদের মালিক হওয়া সত্ত্বেও, তিনি সংসারের প্রতি অনাসক্ত ছিলেন, এবং এই কারণেই তাঁকে "বিদেহ" (যিনি শারীরিক বোধের ঊর্ধ্বে উঠে আত্মিক চেতনায় অবস্থান করেন) উপাধি দেওয়া হয়েছিল। একদিন কয়েকজন পণ্ডিত তাঁর প্রাসাদে এসে তাঁকে প্রশ্ন করেন যে, রাজকীয় বিলাসিতার মধ্যে থাকা সত্ত্বেও তিনি কিভাবে এতখানি বৈরাগ্য লাভ করলেন। জবাবে, জনক তাঁদের আদেশ করেন – তাঁরা যেন প্রত্যেকে একটি করে তৈলপূর্ণ পাত্র হাতে নিয়ে ব্যস্ত মিথিলা শহরের মধ্য দিয়ে এক বিন্দুও তেল না ফেলে হেঁটে আসেন। এটি করতে না পারলে পরের দিন তাঁদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে।

পণ্ডিতদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শহরের হরেকরকম শব্দ ও দৃশ্য তাঁদের জন্য সম্ভাব্য বিপদ হয়ে ওঠে। তেলের দিকে চোখ স্থির রাখতে রাখতে তরলের ছন্দময় দোলগতিই তাঁদের একমাত্র মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়। মিথিলার ব্যস্ত রাস্তায় তৈল পাত্রের প্রতি একাগ্র চিত্ত রাখতে রাখতে তাঁদের বোধ হয় – দুশ্চিন্তার এক-একটি ঘণ্টা যেন অনন্তকাল! দুরুদুরু বুকে সফলভাবে কাজটি শেষ করার পর অবশেষে তাঁদের স্বস্তি লাভ হয়। তবে, জনকের পরবর্তী প্রশ্ন শুনে তাঁদের মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে যায়।

"বলুন তো, পণ্ডিতমহোদয়গণ," গম্ভীর স্বরে জনক বলেন, "মিথিলায় কী কী আশ্চর্য দেখলেন আপনারা?"

পণ্ডিতরা শহর সম্পর্কে একটি কথাও বলতে পারেননি, কারণ আসন্ন মৃত্যুর ভয়ে শুধুমাত্র তৈলপূর্ণ পাত্রটির প্রতিই তাঁদের মনোযোগ ছিল। আতঙ্কে তাঁরা চোখে ঠুলি বাঁধা পদাতিকে পরিণত হয়েছিলেন। এই হলো অটল মনোযোগের শক্তি। যখন আমাদের এমন এক লক্ষ্য থাকে যা জগতের অন্য সকল আহ্বানের চেয়েও শক্তিশালী, সেই সময় আমরা অবিচ্ছিন্ন মনঃসংযোগ করতে সক্ষম হই।

প্রকৃত অনুপ্রেরণা আমাদের অন্তরে নিহিত থাকে। শাস্ত্র ও গুরুর থেকে প্রাপ্ত প্রকৃত জ্ঞান (তত্ত্বজ্ঞান)-এর দ্বারাই এই আন্তরিক প্রেরণা লাভ করা যায়। এই জ্ঞান বারবার মনন করে মস্তিষ্কে গেঁথে নিলে তবেই আমাদের কাজের মধ্যে দৃঢ় প্রত্যয় ঝলসে ওঠে এবং আন্তরিক অনুপ্রেরণা জেগে ওঠে। এর মাধ্যমেই মানুষ সমগ্র বিশ্বকে অনুপ্রেরণা, একাগ্রতা ও বৈরাগ্যের পথ দেখাতে পারে।

স্বামী মুকুন্দানন্দের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা

স্বামী মুকুন্দানন্দের জীবনের একটি ঘটনা বর্ণনা করা যায় – যখন বাহ্যিক প্রেরণার নির্ভরতা ত্যাগ করে স্বামীজি  আন্তরিক প্রেরণা গড়ে তোলার শিক্ষা লাভ করেন। সেই সময় তিনি তাঁর গুরু জগদগুরু শ্রী কৃপালু মহারাজের কাছে শাস্ত্রাধ্যয়ন করছিলেন। গুরুর শিক্ষা প্রচারের জন্য তিনি পাবলিক স্পিকিং, অর্থাৎ শ্রোতাদের সামনে বক্তব্য পেশ করার অনুশীলন করছিলেন। অথচ বক্তৃতা অভ্যাস করার জন্য কোনো শ্রোতা ছিল না তাঁর কাছে। তাই তিনি নিজের ঘরের দেওয়ালের সামনেই বাক্চর্চা শুরু করেন। কিন্তু দেওয়াল তো কোনরকম প্রতিক্রিয়া দিতে অপারগ! নিরুদ্যম হয়ে তিনি গুরুর শরণাপন্ন হন। 

মৃদু হেসে কৃপালুজী মহারাজ তখন তাঁকে এক প্রগাঢ় জ্ঞান দান করেন। তিনি কিন্তু কোনরকম নকল শ্রোতা জোগাড় করার চেষ্টাও করলেন না। বরং, উপনিষদ থেকে একটি তথ্য উদ্ঘাটন করেন -  যে কোন কাজের জন্য অনুপ্রেরণা, অথবা তার বিপরীত, উদাসীনতা – এর কোনটাই বাইরে থাকে না; থাকে আমাদেরই অন্তরে। কাজেই বহির্জগতের প্রেরণার প্রত্যাশা না রেখে আন্তরিক অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলারই চেষ্টা করা উচিত।

শ্রী কৃপালু মহারাজ উদ্ধৃতি দেন:
কামময়া এবায়ং পুরুষ ইতিঃ সা যথাকামো ভবতি তৎক্রতুর ভবতি।
যাৎক্রতুর ভবতি তৎ কর্ম কুরুতে যৎ কর্ম কুরুতে তদ্ অভিসম পদ্যতে॥
kāmamayā evāyaṃ puruṣa iti sā yathākāmo bhavati tatkartur bhavati। 
yātkartur bhavati tatkarma kurute yat karma kurute tad abhisam padyate॥
(বৃহদারণ্যক উপনিষদ ৪.৩)
অনুবাদ: "প্রথমে আমাদের মনে ইচ্ছা জাগে, তারপর আমাদের বুদ্ধি সেই ইচ্ছা পূরণের জন্য আমাদের কাজ করতে অনুপ্রাণিত করে। সেই অনুপ্রেরণায় চালিত হয়ে আমরা কাজ করি, এবং আমরা যেমন কাজ করি, সেই অনুযায়ী আমাদের ভাগ্য গড়ে ওঠে।"

অনুপ্রেরণা আসলে আমাদের অন্তরেই থাকে - কৃপালুজী মহারাজের এই গভীর শিক্ষাটি স্বামীজিকে পুনরায় অনুপ্রাণিত করে তোলে।

অভ্যন্তরীণ প্রেরণা: ‘কেন’(Why Power) -এর শক্তি

অভ্যন্তরীণ প্রেরণার জন্য "কেন (Why)" প্রশ্নের যথার্থ উত্তর প্রয়োজন – অর্থাৎ, কোন একটি কাজ আমি করব “কেন?”। কাজটির গুরুত্ব সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয় আমাদের অনুপ্রেরণার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। উদাহরণস্বরূপ, নিজস্ব কোন এক অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য ভোর ৫টা পর্যন্ত জেগে থাকা এবং বাহ্যিক চাপের কারণে নিদ্রাহীন রাত্রি জাগরণের অনুভূতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ইন্দ্রিয়াণি পরাণ্যাহুরিন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ।
মনসস্তু পরা বুদ্ধির্যো বুদ্ধেঃ পরতস্তু সঃ।।
indriyāṇi parāṇyāhur indriyebhyaḥ paraṁ manaḥ
manasas tu parā buddhir yo buddheḥ paratas tu saḥ
(ভগবদ্গীতা ৩.৪২)
অনুবাদ: "দৈহিক বোধের ঊর্ধ্বে থাকে ইন্দ্রিয়সুখ; ইন্দ্রিয়ের ঊর্ধ্বে মনের অবস্থান। মনের ঊর্ধ্বে বুদ্ধি, এবং বুদ্ধিরও ঊর্ধ্বে আত্মার স্থান।"

ভগবদ্গীতা’র উপরোক্ত উদ্ধৃতি থেকে বোঝা যায় যে, আমরা মনের মধ্যে ইতিবাচক প্রেরণা সৃষ্টি করার জন্য যথাযথ জ্ঞান এবং বিশ্বাস দিয়ে বুদ্ধিকে পুষ্ট করতে পারি। 

চলুন, একটি উপমা দিয়ে "কেন"-এর গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করি। কল্পনাপ্রবণ ছাত্রী ললিতা তার পাঠ্যপুস্তকগুলির প্রতি নিতান্তই উদাসীন। চিন্তিত হয়ে তার পিতামাতা পণ্ডিতমশাই-এর কাছে পরামর্শ চান। পণ্ডিতমশাই ললিতাকে প্রশ্ন করেন, “তুমি পড়াশুনা করে জ্ঞানলাভ করতে চাও না কেন?" দীর্ঘশ্বাস ফেলে ললিতা বলে, "সংখ্যা ও অক্ষর দেখলে আমার বিরক্তা লাগে!" পণ্ডিতমশাই বোঝান, "যদি তুমি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হও, তবে পরের বছরের নতুন বিষয়গুলি আর শেখার সুযোগ পাবে না। তোমার বন্ধুরা এগিয়ে যাবে, আর তুমি পিছিয়ে পড়বে।" ললিতার ভয় হয়। যখন পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসে, তার মধ্যে এক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। পাথরের মতো স্থির হয়ে মনোযোগ নষ্টকারী সমস্ত বাধা অতিক্রম করে ললিতা। ব্যর্থতার ভীতিযুক্ত এবং সফল হওয়ার ইচ্ছাসম্পন্ন অন্তরের আওয়াজ তাকে একাগ্র করে তোলে। পরীক্ষাকেন্দ্রে বসে ললিতা নিজের একটি গোপন শক্তি আবিষ্কার করে: জ্ঞানের সাহায্যে সে তার মনকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। ললিতার গল্প আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে, "কেন" প্রশ্নের একটি বলিষ্ঠ যুক্তিযুক্ত উত্তর থাকলে ছন্নছাড়া মনকেও নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং অখণ্ড মনোযোগের দ্বারা যে কোনো প্রতিকূলতা অতিক্রম করা যায়।

বুদ্ধির মাধ্যমে মন নিয়ন্ত্রণ

বুদ্ধি দিয়ে মনকে নিয়ন্ত্রণ করার অনন্য ক্ষমতা মানুষকে অন্যান্য জীবের থেকে পৃথক করে। পশুরা শুধুমাত্র তাদের ইন্দ্রিয় অথবা মনের চাহিদার দ্বারা চালিত হয়। নিম্নবৃত্তিকে জয় করে বুদ্ধির দ্বারা শেখা মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে জীবনযাপন করার ক্ষমতা একমাত্র মানবজাতিরই আছে।
চেতসা সর্বকর্মাণি ময়ি সন্ন্যস্য মৎপরঃ।
বুদ্ধিযোগমুপাশ্রিত্য মচ্চিত্তঃ সততং ভব।।
chetasā sarva-karmāṇi mayi sannyasya mat-paraḥ
buddhi-yogam upāśhritya mach-chittaḥ satataṁ bhava
(ভগবদ্গীতা ১৮.৫৭)
অনুবাদ: "তোমার প্রতিটি কাজ আমাকে নিবেদিত করো, আমাকে তোমার পরম লক্ষ্য স্থির কর। বুদ্ধিযোগের আশ্রয় নিয়ে সবসময় তোমার চেতনাকে আমার মধ্যে স্থিত করো।"

আমাদের মন নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বুদ্ধির উপর নির্ভরশীল। সঠিক গ্রন্থ পড়ার পর অথবা শোনার পর মনন করে সঠিক জ্ঞান দিয়ে বুদ্ধিকে পুষ্ট করা হলে আমরা উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারি। জ্ঞান হল মনের পথপ্রদর্শক। সঠিক জ্ঞানযুক্ত বুদ্ধিই আমাদের লক্ষ্য ও মূল্যবোধ অনুযায়ী চিন্তাভাবনা ও কর্তব্য নির্ধারণ করে দেয়। এজন্যই শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন তাঁর আশ্রয় নিতে; মনে সবসময় তাঁকে স্মরণ করতে; এবং তাঁর সৃষ্ট বেদ অধ্যয়নের মাধ্যমে বুদ্ধিকে সঠিক জ্ঞানের দ্বারা পুষ্ট করতে যাতে যথার্থ লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়।

প্রকৃত অনুপ্রেরণা শুধুমাত্র একটি ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি নয়; এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর জন্য প্রয়োজন হল - আমাদের উচ্চতম উদ্দেশ্যের অনুকূল জ্ঞান সচেতনভাবে আহরণ করা। সেটা করতে থাকলে আমাদের আন্তরিক অনুপ্রেরণাও বৃদ্ধি পাবে; আবার আমাদের কাজের প্রকৃত উদ্দেশ্যও খুঁজে পাওয়া যাবে। নিয়মিতভাবে জ্ঞান ও কর্মের দূরত্ব যতটা কমানো যাবে, ততটাই আমরা একাগ্রতা ও দৃঢ় চিত্ত লাভ করব।