“মহাশিবরাত্রি”-র রাত্রি আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে চলা ভক্তদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠান, যা ভগবান শিবের সম্মানে উদযাপিত হয়। হিন্দু পঞ্জিকা অনুসারে, এই উৎসবটি ফাল্গুন অথবা মাঘ মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত হয়, যা সাধারণত ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে পড়ে। “মহা” শব্দটির অর্থ ‘সর্বোচ্চ’ বা ‘মহান’, যা ভগবান শিবের অসীম শক্তি ও মাহাত্ম্যকে নির্দেশ করে। উৎসবটির নাম “শিবরাত্রি” এর অর্থ ‘শিবের রাত্রি’, এবং এটি ভগবান শিবের ভক্তদের জন্য বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাত্রি হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভগবান শিবের ভক্তরা এই দিনটিকে অত্যন্ত শুভ সময় বলে মনে করেন এবং গভীর সাধনায় নিমগ্ন হন। এই সাধনার মধ্যে ধ্যান, উপবাস, জপ, এবং পূজা-অর্চনার মতো বিভিন্ন আধ্যাত্মিক অনুশীলন অন্তর্ভুক্ত থাকে। ভক্তদের বিশ্বাস - এই রাত্রিটি আন্তরিক ভক্তি ও হৃদয়ের পবিত্রতা সহকারে পালন করলে আধ্যাত্মিক বিকাশ লাভ করা যায় এবং ভগবান শিবের দিব্য আশীর্বাদ প্রাপ্ত হয়।
মহাশিবরাত্রির ইতিহাস ও প্রচলিত বিভিন্ন আবির্ভাব কাহিনি
দিব্য মিলন : ভগবান শিব ও মাতা পার্বতীর বিবাহবন্ধন
পুরাণ অনুসারে, শিব ও মাতা পার্বতীর বিবাহের দিনটিকে স্মরণ করে মহাশিবরাত্রি উৎসবের সূচনা হয়। এই দেবদম্পতির চিরন্তন প্রেম ও ভক্তির সাক্ষ্য বহন করে বলেই এই উৎসবটি গভীর তাৎপর্যপূর্ণ । ভগবান শিব ও মাতা পার্বতীর এই বিবাহ পুরুষ ও নারী শক্তির সামঞ্জস্যপূর্ণ মিলনের প্রতীক - যা মহাজাগতিক সাম্য ও সৃষ্টির মূল তত্ত্বের প্রতিনিধিত্ব করে।
তাণ্ডব : ভগবান শিবের দিব্য নৃত্য
শিবের দিব্য তাণ্ডব নৃত্য উদযাপিত হয় মহাশিবরাত্রিতে। এই নৃত্য শিবরাত্রি উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ। ভগবান শিবের এই মহাজাগতিক তাণ্ডব নৃত্য সৃষ্টি, স্থিতি এবং সংহারের ছন্দের প্রতীক।
শিব যখন সুশোভিত ভঙ্গিতে নৃত্য করেন, তখন তিনি জীবন, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের চক্রকে প্রকাশ করেন এবং ভক্তদের স্মরণ করিয়ে দেন যে এই জগতের সবকিছুই ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সময়ের প্রবাহ চিরন্তন। এই নৃত্য এতটাই বিস্ময়কর ও মনোমুগ্ধকর যে ভক্তদের হৃদয়ে শ্রদ্ধা ও বিস্ময় জাগিয়ে তোলে। এটি মহাবিশ্ব পরিচালনাকারী মহাজাগতিক শক্তি এবং তাদের মধ্যে বিদ্যমান সূক্ষ্ম সামঞ্জস্য তুলে ধরে।
লিঙ্গের আবির্ভাব : ভগবান শিবের দিব্য রূপের প্রকাশ
কোনো কোনো পুরাণে দাবী করা হয় যে লিঙ্গরূপে শিবের দিব্য আবির্ভাবের দিনটিই হল শিবরাত্রি। শিব পুরাণ ও লিঙ্গ পুরাণে শিবলিঙ্গের উৎপত্তি ও প্রতীকী তাৎপর্য সম্পর্কে গভীর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। সেখানে শিবলিঙ্গকে অগ্নির মহাজাগতিক স্তম্ভ এবং সকল কারণের কারণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। উভয় গ্রন্থেই লিঙ্গকে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পূর্ণ প্রতিরূপ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে ডিম্বাকৃতির পাথরটি মহাবিশ্বের প্রতীক এবং তার ভিত্তি সর্বোচ্চ শক্তিকে নির্দেশ করে, যা তাকে ধারণ করে রেখেছে।
শিবলিঙ্গ ভগবান শিবের অপ্রকাশিত রূপকে নির্দেশ করে, যা সকল ভৌতিক আকার ও গুণের ঊর্ধ্বে। এটি গভীর ধ্যান ও আধ্যাত্মিক জাগরণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচিত হয়।
সমুদ্র মন্থন ও ভগবান শিবের হলাহল বিষ পান
পুরাণ অনুসারে, অমৃত লাভের উদ্দেশ্যে সমুদ্র মন্থন চলাকালীন সময়ে ভয়ংকর বিষ হলাহল উৎপন্ন হয়েছিল, যার জন্য সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে অন্ধকার, অশুভ শক্তি এবং ধ্বংসের সম্ভাবনা দেখা দেয়।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে পশুপতি শিব বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে নিঃস্বার্থভাবে হস্তক্ষেপ করেন, যাতে পৃথিবীকে এই বিষের মারাত্মক প্রভাব থেকে রক্ষা করা যায়। সর্বোচ্চ ত্যাগ ও করুণার নিদর্শন স্বরূপ তিনি সেই প্রাণঘাতী বিষ পান করেন। বিষ পান করার ফলে তাঁর কণ্ঠ নীল বর্ণ ধারণ করে এবং সেই থেকেই তিনি “নীলকণ্ঠ” নামে পরিচিত হন।
অসহনীয় যন্ত্রণার পরেও মহাযোগী শিব তাঁর দিব্য যোগমায়া শক্তির মাধ্যমে সেই বিষকে নিজের শরীরের মধ্যেই ধারণ করে রাখেন, ফলে তা জগৎ-সংসারের ওপর কোনো বিধ্বংসী প্রভাব ফেলতে পারেনি। মহাশিবরাত্রি সেই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করে যখন ভোলানাথ শিব সৃষ্টির কল্যাণের জন্য হলাহল বিষ পান করে সকল জীবের প্রতি তাঁর অসীম ভালোবাসা ও উদ্বেগের প্রকাশ ঘটান।
মহাশিবরাত্রি ও শ্রীকৃষ্ণের মধ্যে সম্পর্ক
ভগবান শিবের একটি চমৎকার লীলা শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সম্পর্কিত। মহারাস লীলার সময় ভগবান শিব শ্রী রাধা-কৃষ্ণের সর্বোচ্চ আনন্দ লাভের জন্য নিজেকে গোপী রূপে প্রকাশ করেছিলেন। তিনি কৈলাসে গভীর ধ্যানে নিমগ্ন ছিলেন, সেই সময় মহারাস চলাকালে শ্রীকৃষ্ণের বাঁশির ধ্বনি তাঁর কানে পৌঁছায়। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ব্রজ (বৃন্দাবন)-এ এসে রাসে প্রবেশের অনুমতি চান।
কিন্তু মহারাসের প্রধান গোপী তাঁকে তাঁর স্বরূপে প্রবেশ করতে অনুমতি দেননি এবং গোপীর রূপে আসতে বলেন। তখন মহাদেব যমুনা নদীতে স্নান করে যোগমায়ার কৃপায় নারীর রূপ গ্রহণ করেন এবং শিবানী গোপী রূপে রাসলীলায় প্রবেশ করেন। সেই সময় থেকে ভক্তরা ভগবান শিবকে “গোপেশ্বর” মহাদেব নামে পূজা করে থাকেন, যার অর্থ “গোপীদের অধিপতি”।
শ্রীমদ্ভাগবতে ঘোষণা করা হয়েছে:
उच्चगानां यथा गंगा देवानामच्युतो यथा।
वैष्णवानां यथा शम्भुः पुराणानामिदं तथा।।
ucchagānāṁ yathā gaṅgā devānām achyuto yathā।
vaishṇavānāṁ yathā śambhuḥ purāṇānāmidam tathā॥
উচ্ছগানাং যথা গঙ্গা, দেবানাম অচ্যুতো যথা।
বৈষ্ণবানাং যথা শম্ভুঃ, পুরাণানামিদং তথা॥
সকল নদীর মধ্যে যেমন গঙ্গা সর্বশ্রেষ্ঠ; সকল দেবতাদের মধ্যে যেমন শ্রীকৃষ্ণ সর্বোচ্চ - তেমনি সকল বৈষ্ণবদের মধ্যে শম্ভু সর্বশ্রেষ্ঠ।
অতএব, আশুতোষ শিব শ্রীকৃষ্ণের ভক্তদের মধ্যে একটি অনন্য ও অত্যন্ত পূজনীয় স্থান অধিকার করে আছেন, বিশেষত তাঁদের কাছে যারা নির্মল ও স্নেহময় প্রেমভক্তি (মাধুর্য ভাব) সহকারে তাঁর উপাসনা করেন এবং অটল আন্তরিকতার সঙ্গে গোপীদের ভক্তিকে অনুসরণ করার চেষ্টা করেন। জগদগুরু শ্রীকৃপালুজী মহারাজ তাঁর রচনায় একজন কৃষ্ণভক্তের ভাবনার প্রকৃত সারমর্ম অত্যন্ত নিখুঁতভাবে প্রকাশ করেছেন:
धरे गोपिका भेष महेश, कृष्ण प्रेम दे दो लवलेश।
dhāre gopikā bhēṣa mahēśa, kriṣṇa prēma dē dō lavalēśa
ধরে গোপিকা ভেষ মহেশ, কৃষ্ণ প্রেম দে দো লবলেশ।
হে মহেশ (শিব), আপনি যিনি গোপীর রূপ ধারণ করেছেন, আমাকে শ্রীকৃষ্ণের দিব্য প্রেমের কেবল একটুখানি অংশ দান করুন।
মহাশিবরাত্রি কীভাবে উদযাপিত হয়?
- মহাশিবরাত্রি পালনের অন্যতম প্রধান আচার হলো উপবাস। কেউ শুধুমাত্র ফল ও দুধ গ্রহণ করেন, আবার কেউ সম্পূর্ণরূপে খাদ্য ও জল থেকে বিরত থাকেন, যা শরীর ও মনকে পবিত্র করে বলে মনে করা হয়।
- ভক্তরা শিবমন্দিরে গিয়ে বিভিন্ন আচার পালন করেন এবং শিবলিঙ্গে জল, দুধ, মধু ও বেলপাতার মতো পবিত্র উপাচার নিবেদন করে পূজা অর্চনা করেন।
- অভিষেক করা, অর্থাৎ পঞ্চামৃত (দুধ, দই, মধু, ঘি ও চিনি—এই পাঁচটি উপাদানের পবিত্র মিশ্রণ) দিয়ে শিবলিঙ্গকে স্নান করানো অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এর মাধ্যমে আধ্যাত্মিক আশীর্বাদ লাভ হয় এবং আত্মা পবিত্র হয়।
- সারা রাত ভক্তরা জেগে থেকে প্রার্থনা, জপ এবং ভজন-সঙ্গীত পরিবেশন করেন, যাতে বিশ্বেশ্বর শিবের দিব্য উপস্থিতি লাভ করা যায়।
- কিছু ভক্ত হোম বা যজ্ঞ সম্পাদন করেন, যেখানে শিবশঙ্করকে উৎসর্গ করে বৈদিক মন্ত্র উচ্চারণ করা হয় এবং অন্নশস্য, ভেষজ ও ঘি অগ্নিতে আহুতি দেওয়া হয়।
- ভক্তরা আশীর্বাদ লাভের উদ্দেশ্যে মহাকালেশ্বর, কেদারনাথ, সোমনাথ এবং কাশী বিশ্বনাথের মতো বিখ্যাত শিবমন্দিরে তীর্থযাত্রা করেন।
- শিবরাত্রির রাতে শিবমন্দির ও রাস্তায় ‘ধুনী’ নামে অগ্নিকুণ্ড জ্বালানো হয়। ভক্তরা তার চারপাশে একত্রিত হয়ে ভজন ও শিবসঙ্গীত পরিবেশন করেন।
- মহাশিবরাত্রি উপলক্ষে ভগবান শিবের মহিমা উদযাপন করতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ভক্তিমূলক সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করা হয়।
মহাশিবরাত্রিতে ভগবান শিবকে কী কী নিবেদন করা হয়?
পুরাণ অনুসারে, ভগবান শিব কিছু নির্দিষ্ট উপাচার পছন্দ করেন। এর মধ্যে রয়েছে - জল (জলাভিষেক), শিবলিঙ্গের অভিষেক, বেলপাতা, দুধ, দই, চাল, ধুতুরা ফল, ভাঙ পাতা, চন্দন, ঘি, মধু, শমী (খেজরি) পাতা এবং অপরাজিতা, আকন্দ, করবী, জুঁই, বেলফুল, পদ্ম, জবা ও গোলাপসহ বিভিন্ন ফুল।
এছাড়াও ভক্তেরা ফলমূল, বিশেষ করে কুল, মৌলি (পবিত্র লাল-হলুদ সুতো), পবিত্র গঙ্গাজল এবং জাফরান নিবেদন করেন, যাতে ভগবান শিবের দিব্য আশীর্বাদ লাভ করা যায়। বিভিন্ন মিষ্টান্ন - বরফি, পেড়া, পঞ্জিরি, হালুয়া ও ক্ষীর ভক্তিভরে নিবেদন করা হয়। এই সকল উপাচার নিবেদনের মাধ্যমে ভক্তরা ভগবান শিবকে সন্তুষ্ট করে তাঁর আশীর্বাদে পরিপূর্ণ জীবন কামনা করেন।